মধ্যরাতে ঘুম ভেঙে যায় । কাজী মাহমুদুর রহমান

0

মধ্যরাতে ঘুম ভেঙে যায়
– কাজী মাহমুদুর রহমান

প্রতিদিন মধ্যরাতে ঘুম ভেঙে যায়
নিঃসঙ নির্জন রাতে দূরে কোথাও
কোনো রাতজাগা পাখি আচমকা ডেকে ওঠে,
ভয়ার্ত কান্নার মতো শব্দ শোনা যায়,
আমার ঘুম ভেঙে যায়।

কবিতা যখন ছন্দ হারায় , ভালোবাসাও তেমনি
মিল – অমিলের দ্বন্দে ক্রমে ক্রমে দূরে সরে যায়।
দুটি চেনা মানুষ কবে, কোন দিন অচেনা হয়ে যায়
পান্থশালার মতো রাত্রিযাপন,
সকাল হলেই পাখির মতো উড়ে চলে যায়।

আমাদের ঘরবাড়ি যদিও পান্থশালা নয়,তবুও ঘরের
সেই কবেকার গৃহসাজ, রঙিন শয্যার নকশিকাঁথার
আঁকিবুঁকি টুটোফাটা, ম্লান। জং ধরা পেরেকে ঝুলে থাকা চেরা দেয়ালের স্মৃতিছবি ঘুণে জরজর,
বুকের ভেতরেও ঘুণপোকাদের বাসা,তাদের ঘর সংসার,
আমি নষ্ট কষ্টে বুঝেও তা বুঝি না। নিজের অক্ষমতায়
শুধু মধ্যরাতে আমার ঘুম ভেঙে যায় ।

কতকাল লিখালিখি নেই, কলমে কালি নেই
নদীর স্রোতের মতন বুকের ভেতর থেকে উঠে আসা
শব্দের ঢেউ নেই, কবিতার ছেঁড়া খাতা
নির্জিব বেড়ালের মতো ঘুমিয়ে থাকে
ধুলোময় র্টেবিলের ওপর।

মধ্যরাতে আমার ঘুম ভেঙে যায়, জেগে কত কী ভাবি ।
রাতভর একা একা হাঁটি, ছোট্ট ঘর, বারান্দায় কখনো দাঁড়িয়ে, কখনো পায়চারী।
ভাঙা জানালার ফাঁক দিয়ে ক্ষয়া চাঁদের বিবর্ন হলদেটে আলো জোনাকির মতো জ্বলে, নেভে
আমার ঘরের মেঝেয় কিংবা চালসে চোখের ছায়ায়।

যখন মধ্যরাতে ঘুম ভেঙে যায়, অন্ধকার দিঘিজলে মাছেরা সাঁতার কাটে,
অথবা দূরে কোথাও বস্তির নিঃসংগ কুকুর
করুণ স্বরে একা কাঁদে,
তখন মধ্যরাতে আমার ঘুম ভেঙে যায়,
ঘুম ভেঙে যায়।
ঘরের অন্ধকার কোণে আধ ভাঙা কাঠের চৌকিতে এক প্রাচীন নারী এলোমেলো ছেঁড়া কাঁথার পুটলির মতো শুয়ে থাকে, অথবা আমারই মতো জেগে
ঘুৃমঘুম ভানে আমাকেই দ্যাখে তার দুঃখপোড়া চোখে।

হয়তো স্মৃতি হাতড়ায় । ভাবে, এই নুব্জ বৃদ্ধই কি একদা ছিল দূরন্ত তরুণ আড্ডাবাজ কবি, আমার আঁচলের ছায়ার মতো প্রেমিক,অন্ধের মতো ভালোবেসে আমার জীবন সংগী ?
ওহ সেই মানুষ, সেই দিন হারালো কোথায় ?
আমি এক সময় ওর শিয়রে বসি, কাঁপা কাঁপা হাতে ওর মাথা ছুঁয়ে বলি, ঘুম নেই ? ঘুম?
ও বোধহয় ম্লান হাসে। বলে, আমি স্মৃতি কাতরতার মধ্যরাত নয়, তোমার মতো পায়চারী আর দীর্ঘ যন্ত্রণায় নয়, আমি এখন চিরঘুমের অপেক্ষায় ।

বয়সের ভারে আমি তোমার সেই কবিতার রূপবতী নই। আমি দুর্জন দানবের হাতে লুন্ঠিত, ধর্ষিতা,
কবিতার ছেঁড়া পাতা, কলংকিত স্বপ্নহীন নারী
যার কষ্টগুলো গাছের কোটরে জমতে জমতে
এখন এক প্রাচীন গাছপাথর ।

কবি , আমি তোমার অতীত দেহের সুঘ্রাত যৌবন নয় ,
শিহরিত আকাংখা নয় — মাংসলোভী হায়েনাদের উল্লাসের স্মৃতি নিয়ে
এখন ছেঁড়া কাঁথার গন্ধ শুকি,
বয়সের পাথরগুলো গুনি,
এক এক করে পাথরগুলো ছুঁড়ে ফেলে দিই
জানালার বাইরে উঠোন কিংবা মৃতবাগানের জঞ্জালে।

আজ রাত্রি শেষে পাথরও শেষ হয়ে যাবে,
তোমার কবিতার শেষ কথাটি তখনই শেষ হয়ে যাবে।
আমি ওর শীর্ণ হাতটি নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলি,
কে জানে শেষের শেষ আছে কি নেই !
শেষ পাথরটি আমার জন্যে রেখো হায়েনাকে হত্যার।

Share.

Leave A Reply